ময়ূর নদ-এর মৃত্যু

শহর খুলনা কী ভালো থাকবে?

গৌরাঙ্গ নন্দী

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের বিভাগীয় শহর খুলনার এক সময়ে বেশ নাম-ডাক ছিল। বলা হতো, বন্দর ও শিল্প নগরী। প্রশাসনিক বিভাজনে মোংলা বন্দর এখন খুলনার পূবের জেলা বাগেরহাটের অধীনে; অন্যদিকে, শিল্প বলতে অনেকগুলো পাটকল, বস্ত্রকল, নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল সবই হারিয়ে গেছে। রাষ্ট্র পরিচালিত এসব মিলগুলো লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শহরের প্রকৃতিও বিরূপ হয়েছে। ভৈরব-রূপসার তীরে গড়ে ওঠা খুলনার পশ্চিম দিকে ছিল ময়ূর নদ। শহরের বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য ২৬টি নিষ্কাশন খাল এই নদের সঙ্গে যুক্ত। নদ-এর মুখে দশ কপাট-এর (ভেন্ট) গেইট বসিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করায় তাতে আর জোয়ারের পানি আসে না। উজানেও পানির প্রবাহ নেই। ফলে ময়ূর এখন হাঁসফাঁস করছে। প্রশ্ন উঠেছে, ময়ূর মরলে কী খুলনা শহর ভালো থাকবে?

বলা যায়, পশ্চিম সীমানার এই ময়ূর নদ হচ্ছে খুলনার ‘নিকাশী ধমনী’। যেটির একপ্রান্ত বিল পাবলা হতে কিছুদূর দক্ষিণমুখী আঁকাবাঁকাভাবে এগিয়ে পূব দিকে ঘুরে রূপসা নদীতে মিশেছে। এই ময়ূর নদেই নগরের বর্জ্য পানি নিষ্কাশন ছাড়াও নগরে জমা বৃষ্টির পানিও নিষ্কাশিত হয়। পরিসংখ্যান মতে, প্রতিদিন দুই লাখ ৪২ হাজারেরও বেশী লিটার তরল বর্জ্য এতে নিষ্কাশিত হয়। যা পুরো শহরের মোট বর্জ্যের ৭৫ শতাংশ। কিন্তু এই নদটি এখন প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। জায়গায় জায়গায় একেবারে শুকিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও দামদলে পূর্ণ।

ময়ূর নদটিতে যখন রূপসার জোয়ারের পানি আসতো, তখন এর প্রবাহ বজায় ছিল; যদিও উত্তরের দিকে রায়েরমহলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বা-পাউবো) চার কপাটের একটি স্লুুইস গেইট তৈরি করায় প্রবাহে ভাটা পড়ে। পরে এই প্রবাহে চূড়ান্ত বাধা পায় বা-পাউবো রূপসা নদীর প্রায় মুখে লবনচরার আলুতলায় দশ কপাটের একটি গেট তৈরি করায়। এটি ১৯৮৪ সালের ঘটনা। সেই বছর নদীর জোয়ারের পানি এসে বর্তমান নিরালা আবাসিক এলাকা, যা তখন বিল (নীচুভূমি) ছিল, তা পানিতে তলিয়ে গেলে ওখানে গেইট নির্মাণ করা হয়। এর উদ্দেশ্যই ছিল জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণ করা। এতে নিরালায় আবাসিক এলাকা তৈরি হলো। ধীরে ধীরে আশে-পাশের সকল নীচু এলাকায় নতুন ভবনের পর ভবন উঠে নগরের পরিধি বিস্তৃত হলো, বিপরীতে মযূর নদ শুকিয়ে নালায় পরিণত হয়েছে।

পানি নিয়ন্ত্রণের জন্যে যে কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তা নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং নদীর নিজেরই বর্জ্য পরিষ্কার করার যে ক্ষমতা, তা হারিয়ে গেছে। স্বাভাবিক প্রবাহ থাকলে নদীতে জমা হওয়া বর্জ্য, পলি স্বাভাবিকভাবেই অপসারিত হয়ে থাকে, যাতে নদী ভরাট হতে পারে না। বর্তমানে নদীটির আঁকাবাঁকা পুরো গতিপথ স্থবির। প্রায় আবদ্ধ একটি খাত। আরও আছে বসতির আগ্রাসন। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সকলেই যে যার মতো করে নদীর জায়গায় পাকা স্থাপনা গড়ে তুলেছে; যাতে জলপথ হিসেবে এর স্বাভাবিক জীবনের ইতি ঘটেছে।

প্রবাহ না থাকা এবং ব্যাপক দূষণের ফলে আক্ষরিক অর্থেই নদীটির জৈবিক শ্বাসরোধের ঘটনা ঘটেছে। ন্যাশনাল স্যানিটারি ফাউন্ডেশন (এনএসএফ)-এর ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স ব্যবহার করে গবেষকরা ময়ূরের পানিকে ‘খারাপ’ থেকে ‘খুব খারাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তথ্যমতে, নদীটি এখন শহরের প্রতিদিন তৈরি হওয়া আড়াই লাখ লিটার তরল বর্জ্যের পাশাপাশি ২৪০ টন কঠিন বর্জ্যও ধারণ করে। এতে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ ভয়ানক পরিমাণে কমে যায়। ২০১৯-২০২০ সালের তথ্য বলছে, ময়ূরের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও)-এর পরিমাণ প্রতি লিটারে মাত্র এক দশমিক ৫৩ হতে দুই দশমিক চার মিলিগ্রাম। যা নিরাপত্তা সীমা ৬ মিলিগ্রাম/লিটার হতে অনেক কম। এতে জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি) ১৩১ দশমিক ৭৩ মিলিগ্রাম/লিটার; যা নিরাপত্তা সীমা (<৫১০ মিলিগ্রাম/লিটার) হতে অনেক বেশী। মলজাত কলিফর্ম (এফসি) প্রতি ১০০ মিলিমিটারে ২৫ হাজার ১৮৫ নাইট্রোজেন। যা নিরাপত্তা সীমা প্রতি ১০০ মিলিলিটারে এক হাজার নাইট্রোজেন অপেক্ষা ২৫ গুণেরও বেশী। ঘোলাটে ভাব এক হাজার ৫১০ দশমিক ৭৬ এনটিইউ; অথচ এর নিরাপত্তাসীমা ১০ এনটিইউ।

বলাইবাহুল্য যে, নিরাপত্তা সীমার চেয়ে ২৫ গুণেরও বেশি মল দ্বারা দূষণ এবং অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় না থাকার কারণে, এই নদীটি একটি বিষাক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। বলা হচ্ছে, ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ে ময়ূর অববাহিকার ভূমি ব্যবহারের এক আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। নদটি ছিল একটি প্রাকৃতিক, শোষণকারী “স্পঞ্জ”, যা পরবর্তীতে একটি অভেদ্য কঠিন আবরণে পরিণত হয়েছে। জলাভূমিটির ধারণক্ষমতা কমেছে ৭৩ শতাংশ।

আলুতলা স্লুইস গেট, যা স্থানীয়ভাবে “দশ গেট” নামে পরিচিত, তা “সামাজিক ক্ষমতার জাল” বা “সোশ্যাল পাওয়ার ম্যাট্রিক্স”-এর কেন্দ্রবিন্দু হিশেবে দেখা দিয়েছে। এখানে প্রকৌশলবিদ্যার সাথে দুর্নীতির মিলন ঘটেছে। যাতে প্রধান পক্ষগুলোর মাঝে এক ধরণের অবিরাম সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আছে গভীর সমন্বয়হীনতা। কেসিসি পানি নিষ্কাশনের জন্য এই গেটটি পরিচালনা করে, কিন্তু কাঠামোটির মালিক বা-পাউবো।

খুলনার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে, ময়ূর নদের ব্যবস্থাপনাকে ‘শুধুমাত্র নিষ্কাশন’ মানসিকতা থেকে দেখার পরিবর্তে ‘অংশগ্রহণমূলক পুনরুদ্ধার’ মডেলে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন। কেসিসি এবং বা-পাউবো’র সঙ্গে একটি কার্যকর সমন্বয়ও জরুরী। প্রাকৃতিক এই বাস্তুতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা এবং খুলনা শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নততর করতে এটি টিকিয়ে রাখার কোন বিকল্প নেই।

অবশ্য, কেসিসি এই নদীটি রক্ষায় একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে, যা কোন কাজে আসেনি। অথচ টাকা খরচ হয়েছে। কেসিসি ময়ূর নদ খনন ও পুনরুদ্ধারের জন্য ২০১৪, ২০১৯ এবং ২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। ২০১৪ সালে নদী পরিষ্কার ও ৫.৯ কিলোমিটার নদী খননের জন্য ৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা খরচ করে। ২০১৯ পুনঃখনন ও উচ্ছেদ অভিযানের নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এর মাধ্যমে নদী ও সংযুক্ত খালগুলোর ধারে শত শত অবৈধ স্থাপনা জরিপ করা হয়।

পরবর্তীতে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেরও উদ্যোগ নেয়া হয়; যা মাঝপথে থেমে যায়। ২০২২২০২৬ পর্বে বাস্তবায়িত হয় নিষ্কাশন ও ড্রেজিং প্রকল্প। ৮২৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পে একটি সমন্বিত নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা ছিল, যার মধ্যে ময়ূর নদ এবং এর সাথে যুক্ত বেশ কয়েকটি খাল পুনঃখনন করার পরিকল্পনা ছিল। এই প্রকল্পের অংশ হিশেবে ২০২২-২৩ সালে ময়ূর নদের প্রায় ৬ কিলোমিটার খননের জন্য ৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা খরচ করা হয়। ময়ূর নদের উত্তর অংশে বিল পাবলায় যুক্ত ক্ষুদের খাল খননেও ব্যয় করা হয় ৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এতো কিছু করেও ময়ূরের হাঁসফাঁস দশার মুক্তি হয়নি।

নদীটি রক্ষায় কেসিসি আবারও ‘ময়ূর নদ পুনরুজ্জীবন ও জলবায়ু-সহনশীল স্যানিটেশন’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ২০২৫ হতে ২০২৮ সাল মেয়াদী এই প্রকল্পে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও ডাচ সরকার ৩৫০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার কথা। এর মূল লক্ষ্য হলো নদীতে পতিত হওয়ার আগেই বর্জ্য পানি পরিশোধন করা এবং নদী তীরকে একটি নান্দনিক, পর্যটক-বান্ধব সবুজ স্থানে রূপান্তরিত করা। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এডিবি’র শর্ত হচ্ছে, নদীর তীরে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। এই কাজটি ২০২৫ সালের মধ্যেই সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। যা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। পরের কাজটি হচ্ছে ১০টি নতুন পানি পরিশোধন কেন্দ্র (প্লান্ট) স্থাপন করা। এগুলো শহরের ২৬টি প্রধান নিষ্কাশন খালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত শহুরে তরল বর্জ্যকে পরিশোধন করবে; যাতে অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য নদীর তলদেশে জমা হয়ে ভরাট করতে না পারে। উপরন্তু প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য ময়ূর নদকে সরাসরি বিল ডাকাতিয়া জলাভূমি ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত করার জন্য উজানের খালগুলোর (মতিয়াখালি ও ক্ষুদের খাল) সাথে যুক্ত করার কথা। আর অবৈধ দখল রোধ করতে নদীর তীর বরাবর হাঁটার পথ তৈরি করার কথা।

প্রকল্পটির সফলতা নিয়ে নগরবাসীর শঙ্কা রয়েছে। প্রকল্পটির মূল কাজ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ যা এখনও করা যায়নি এবং দশগেট ব্যবস্থাপনা বিষয়েও কোন যৌক্তিক সমাধান হয়নি; তাহলে কী এই প্রকল্পও ব্যর্থ হবে!! ময়ূর নদের মৃত্যু এবং স্বাস্থ্যকর নগরের স্বপ্ন কী অধরাই থেকে যাবে!!!

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও পরিবেশ গবেষক।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন